জনপ্রিয়টাঙ্গাইলঢাকা বিভাগদর্শনীয় স্থানবাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

মহেরা জমিদার বাড়ি কিভাবে যাবেন,কোথায় থাকবেন, ভ্রমণকালীন খাওয়া দাওয়া সহ বিস্তারিত ট্যুরিস্ট গাইড!

মহেরা জমিদার বাড়ি : আপনার কি ঐতিহাসিক বা পুরোনো জমিদার বাড়ি ঘুরে বেড়াতে খুব ভালো লাগে? এসব গা ছমছম করা পুরোনো রহস্যজনক বাড়িগুলির প্রতি কি ভ্রমণের ক্ষেত্রে আপনি যথেষ্ট আগ্রহবোধ করেন? যদি করে থাকেন তবে আজকের এই আয়োজন আপনার জন্যই। বাংলাদেশ বেশ পুরোনো একটি অঞ্চল হওয়ায় কালে কালে এর বিভিন্ন স্থান শাসন করেছেন অসংখ্য রাজা-বাদশারা।

যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে রাজপ্রাসাদ কিংবা জমিদার বাড়ি। এসব জমিদার বাড়িকে বর্তমানে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করা হয়। তেমনই একটি জমিদার বাড়ি হলো এই মহেরা জমিদার বাড়ি। চলুন তবে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক। 

মহেরা জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইল – Mohera Jomidar Bari Tangail

মহেরা জমিদার বাড়ি পরিচিতি

নাম শুনেই নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন এটি একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান এবং জমিদার বাড়ি। যা টাঙ্গাইল জেলার অনেকগুলি পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে একটি। মূলত এটি টাঙ্গাইল জেলার মহেরা ইউনিয়নের বহু পুরোনো একটি জমিদার বাড়ি। যার কারণে এর নামকরণের ক্ষেত্রে ইউনিয়নের নাম অর্থ্যাৎ “মহেরা” শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। 

এই দর্শনীয় স্থানটির ঐতিহাসিক দিক ছাড়াও উপভোগ করার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাড়িটির পুরো পরিবেশ। উপরে নীল আকাশ আর নিচে কাঁচা সবুজ রংয়ের ঘাস থিমের কার্পেট! মনে হবে কোনো এক স্বপ্নের জগতের যেকোনো একটি বাড়িতে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এছাড়াও এই জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক দিক কিংবা পুরোনো ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় এই জমিদার বাড়িটির ভ্রমণ মিশনে৷ 

ধারণা করা হয় এই মহেরা জমিদার বাড়ির বয়স বর্তমানে প্রায় শত বছরেরও বেশি। সেদিক দিয়ে এই স্থাপনাটি ভ্রমণে আপনি শতবছরের পুরোনো একটি জমিদার বাড়ি উপভোগ করার পাশাপাশি এর ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ লুফে নিতে পারেন। টাঙ্গাইল জেলা মূলত অসংখ্য পুরোনো জমিদার বাড়ির জন্যে বেশ বিখ্যাত। সেদিক দিয়ে এই মহেরা জমিদার বাড়ি হলো সৌন্দর্য এবং জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে একেবারে প্রথম সারির একটি স্থাপনা। 

এছাড়াও মহেরা জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর স্থাপনাশৈলীর সৌন্দর্য। এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করাকালীন সময়ে একইসাথে মোগল, সিন্ধু, এবং রোমান যুগ কিংবা সাম্রাজ্যের স্থাপত্যরীতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ এই বাড়িটি ভ্রমণে আপনি একইসাথে মোগল, সিন্ধু, এবং রোমান আমলের স্থাপত্যরীতি উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। 

মহেরা জমিদার বাড়ি এর অবস্থানMohera Jomidar Bari Location

তাহলে মহেরা জমিদার বাড়ির পরিচিতি সম্পর্কে তো জানা গেলো। এই পর্বে আমরা জেনে নিবো মহেরা জমিদার বাড়ির অবস্থানগত দিক সম্পর্কে। মূলত টাঙ্গাইল জেলার একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এই জমিদার বাড়ি। ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করে বললে বলতে হয় ঢাকার টাঙ্গাইল সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে গেলেই দেখা মিলবে এই মহেরা জমিদার বাড়ি নামক ঐতিহাসিক স্থাপনাটির। 

মহেরা জমিদার বাড়ি এর ইতিহাস 

যেহেতু মহেরা জমিদার বাড়ি বেশ পুরোনো এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সেহেতু নিশ্চয় এর একটি ইতিহাস বা গল্প রয়েছে। কেবল মহেরা জমিদার বাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলি ভ্রমণ করলেই এসব স্থানের পেছনের গল্প সম্পর্কে জানা সম্ভব হয় না! এক্ষেত্রে প্রয়োজন এসব স্থাপনার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। আমাদের আজকের আর্টিকেলের এই পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করবো মহেরা জমিদার বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে! 

শুরুতেই বলা হয়েছে এই স্থাপনাটি মূলত শত বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। ইতিহাস বলছে ১৮৯০ দশকের বেশ আগেই এই জমিদার বাড়িটি স্থাপিত হয়েছিলো। যা তৈরি করতে সে-সময় ব্যবহার করা হয়েছে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলকে। 

মূলত সাহা বংশের জমিদারদের হাতেই গড়ে উঠেছিলো Mohera Jomidar Bari নামক এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। সাহা বংশের ৪ ভাই একসাথে মিলে সে-সময় এই জমিদার বাড়ি তৈরিতে হাত দেন এবং তার নির্মাণ কাজও একটা সময় সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন। কথিত আছে পরবর্তীতে এসে এই সাহা বংশ রায় চৌধুরী পদবী গ্রহণ করেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক বাহিনীর হাতে পড়ে এই স্থাপনাটি। ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেও রেহাই পায়নি বাংলার এই অমূল্য রতন খ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। ১৯৭১ সালের দিকে এই মহেরা জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অংশে ধ্বংসের খেলা চালিয়েও শান্ত হয়নি পাক হানাদার বাহিনী। এর পাশাপাশি তারা সে-বছর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জমিদার বাড়ীর কূলবধূ সহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। 

শুরুতে সবুজ ঘাসের চাদরে সাদা রংয়ের পদ্মের মতো মনে হবে এই স্থানটিকে। সে যাইহোক! ঐতিহাসিক বিষয়াদি নিয়ে যাদের বাড়তি ঝোঁক রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ হতে পারে বিশাল সুযোগ। যেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক দিক সম্পর্কে অনায়াসে অসংখ্য তথ্য লুফে নেওয়া যায়। 

মহেরা জমিদার বাড়ির স্থাপনাশৈলী 

মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণে গিয়ে সবার আগে যে ব্যাপারটি আপনার নজর কাড়বে সেটি হলো এর ‘বিশাখা সাগর’ নামের বিশাল এক দীঘি। এছাড়াও চোখে পড়বে জমিদার বাড়িটিতে প্রবেশের জন্য থাকা ২টি সুরম্য গেট। ও হ্যাঁ! দীঘির মতো আরো ২ টি ছোট ছোট পুকুরও চোখে পড়বে এই ভবনের পেছনের দিকে। এসব পুকুরের নাম যথাক্রমে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর। 

মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণে গেলে মূল ফটক দিয়ে দেখা যাবে চৌধুরী লজ। এই সুন্দর নকশাখচিত ভবনের ভেতরকার ঢেউ খেলানো ছাদ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এছাড়াও মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ৬ টি কলামে সাজানো বাইজেনটাইন স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মহারাজ লজ ভবন, নীল ও সাদা রঙের মিশ্রনে ভরা আনন্দ লজ ভবন এবং কালীচরণ লজ।

স্থাপনাশৈলী ছাড়াও Mohera Jomidar Bari ভ্রমণ আপনাকে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ দেশী বিভিন্ন প্রজাতির আম্র বৃক্ষসহ নিভৃত পল্লীতে ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা নির্মল, নির্ঝর শান্ত পরিবেশ উপভোগের সুযোগ তৈরি করে দিবে। 

মহেরা জমিদার বাড়িতে যেভাবে যাবেন

মূলত Mohera Jomidar Bari যেহেতু ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলায় অবস্থিত সেহেতু স্থাপনাটি সরাসরি উপভোগ করতে চাইলে সর্বপ্রথমে আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে টাঙ্গাইল জেলায়। বলে রাখা ভালো ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসের প্রতি সিটের মূল্য প্রায় ১৫০ টাকার মতো পড়তে পারে। টাঙ্গাইল পৌঁছে নাটিয়াপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে নেমে ০৩ কিঃমিঃ পূর্ব দিকে গেলেই চোখে পড়বে জনপ্রিয় এই স্থাপনা মহেরা জমিদার বাড়ির। 

মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণে যেখানে খাওয়া-দাওয়া করবেন

ভ্রমণে গিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব সারতে না পারলে সে ভ্রমণ আর জমে উঠেই না। সুতরাং একটি ভ্রমণ গাইডলাইনে স্থানটি ভ্রমণে খাবার-দাবারের পর্ব সেরে নেওয়ার উপায় সম্পর্কেও তথ্য থাকা চাই। সেই সুবাদে এই অংশে আমরা জানবো মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ করতে গিয়ে কোথায় খাওয়া-দাওয়া করবেন সে-সম্পর্কে। মহেরা জমিদার বাড়িকে ঘিরে রয়েছে ডাক বাংলোর ব্যবস্থা। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে পারেন। এছাড়াও টাঙ্গাইল মেইন সিটি থেকেও খাবার সংগ্রহ করে নিতে পারেন। 

মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণে যেখানে রাত্রিযাপন করবেন

Mohera Jomidar Bari ভ্রমণে গিয়ে রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে সেখানকার ডাক বাংলোতে উঠে পড়তে পারেন৷ এসব ডাক বাংলোতে বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যবস্থা থাকায় পছন্দমতো প্যাকেজের সাহায্যে সাশ্রয়ী মূল্যে রাত কাটানো কিংবা ক’টা দিন সেখানে অবস্থান করার ব্যবস্থা করে নেওয়া যায়। 

ইতি কথা

মহেরা জমিদার বাড়ি নিয়ে এই ছিলো আমাদের আজকের এই আয়োজন। চেষ্টা করেছি এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটির পরিচিতি, ইতিহাস, স্থাপনাশৈলীসহ সম্পূর্ণ একটি ভ্রমণ গাইডলাইন শেয়ার করার। আশা করি তাতে সক্ষম হয়েছি। তবুও এই দর্শনীয় স্থানটি সম্পর্কে যদি আর কোনো প্রশ্ন থাকে কিংবা জানানোর মতো কোনো তথ্য থাকে তবে তা আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। এছাড়াও আমাদের আজকের এই আয়োজন ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *