আহসান মঞ্জিল জাদুঘর - ট্যুরিস্ট গাইড! (Ahsan Manzil Museum) »
Skip to content
আহসান মঞ্জিল জাদুঘর – ট্যুরিস্ট গাইড! (Ahsan Manzil Museum)

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর – ট্যুরিস্ট গাইড! (Ahsan Manzil Museum)

আহসান মঞ্জিল

কে শুনেনি আহসান মঞ্জিলের নাম? মোটামুটি প্রতিটি বাঙালির কাছেই এই অনন্য স্থাপনাটি বেশ পরিচিত। যদিও অনেকেই হয়তো তা স্বচক্ষে উপভোগ করতে পারেনি। তবে দেশের অন্যতম একটি পর্যটন স্থাপনা হিসেবে পর্যটন শিল্পে বেশ গুরুত্বের সাথে নিজের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে স্থাপনাটি।

ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি ঘিরে যেনো ভ্রমণপিয়াসীদের আগ্রহের কোনো শেষ নেই। সবচেয়ে মজার ব্যপার হলো খুব মনোযোগ দিয়ে পরখ করলে যেকোনো দর্শনার্থী নবাবী আমলের পরিবেশে হারিয়ে যাবে সহজেই। চলুন আজ এই আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে জুড়ে দেওয়া গল্পে হারিয়ে যাওয়া যাক। 

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর – Ahsan Manzil Museum

আহসান মঞ্জিল পরিচিতি

মূলত আহসান মঞ্জিল মূলত নবাবী আমলের একটি অনন্য স্থাপনা। ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি একটা সময় মূলত ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বর্তমানে স্থাপনাটিকে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়ক টিম। 

প্রতিদিনই এখানে ভ্রমণপিয়াসীদের আনাগোনাই প্রমাণ করা স্থাপনাটি পুরোনো নবাবী পরিবেশ উশকে দিতে কতটা সক্ষম! জাদুঘরের ভেতরকার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে এবং নিজেদের শিকরের সন্ধানে ছুটির দিনে হাজারো মানুষের ঢল নামে এই আহসান মঞ্জিলে। 

এছাড়াও পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই মঞ্জিল। বলে রাখা ভালো এক সময় কিন্তু এই অনন্য স্থাপনাটি সাধারণ জনগনের কাছে পিংক প্লেইস হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলো। কেননা একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন পুরো ভাবনটিকে পিংক কালার দ্বারা আবৃত করা হয়েছিলো। অর্থ্যাৎ ভবনে ব্যবহার করা হয়েছিলো পিংক কালার। ফলে স্থাপনাটি অনেকের কাছে পিংক প্লেইস হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। 

আহসান মঞ্জিল কোথায় অবস্থিত – Ahsan Manzil Location

চলুন এবার জানা যাক আহসান মঞ্জিলের অবস্থান সম্পর্কে। যা আপনাকে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সরাসরি উপভোগ করার ক্ষেত্রে আশা করি কিছুটা হলেও কাজে দিবে। 

এটি মূলত পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা। আরেকটু বিস্তারিতভাবে বললে বলতে হয় আহসান মঞ্জিল নামক এই অনন্য স্থাপনাটি মূলত পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলী এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। 

আসহান মঞ্জিলের ইতিহাস 

আগেই বলেছি এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপনাটির একটি সমৃদ্ধ ইতিহাসও রয়েছে? আপনি কি জানতে চান সে ইতিহাস সম্পর্কে? জানতে চাইলে আমাদের সাথেই থাকুন এবং জানুন আহসান মঞ্জিলের পেছনের গল্প। 

সময়টা মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। বলে রাখা ভালো জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে “রংমহল” নামে একটি হেরেম প্রতিষ্ঠা করেন। 

কিছু বছর পর একটা সময়ে এসে তার ছেলে শেখ মতিউল্লাহ এই হেরেমটি একজন ফরাসি বণিকের কাছে বিক্রি করে দেন। ওই ফরাসি বণিক স্থাপনাটিকে একটি বাণিজ্য কুঠি হিসেবে তার নিজের ব্যবসায়ীক কাজে ব্যবহার করা শুরু করে। 

পরবর্তীতে একটা সময়ে এসে ভবনটি ১৮৩০ সালে বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গণির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ এর হাতে চলে আসে। যা তিনি সেই ফরাসি বণিকের কাছ থেকে কিনে নিজেই বসবাস শুরু করেন। শুধু তাই নয়! আবদুল গণি এই ভবণটিকে ঘিরে মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি নামক একটি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। যা একটি মাস্টার-প্ল্যানের জন্ম দেয়। 

এই মাস্টার প্ল্যানের সুবাদে প্রধান ইমারত হিসেবে ব্যবহার করা আহসান মঞ্জিল নামক স্থাপনাটিকে। সময় গড়াতে গড়াতে নিজের প্ল্যানকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৮৫৯ সালে নওয়াব আবদুল গণি একটি প্রাসাদ নির্মাণ করার কার্যক্রম শুরু করেন৷ ১৮৭২ সালে সমাপ্ত হওয়া এই প্রাসাদ তার প্রিয় ছেলে খাজা আহসানুল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল‘। 

সেই সমকালীন সময় থেকেই নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি রংমহল ও পুরাতন ভবনটি অন্দরমহল হিসেবে সারা বাংলায় পরিচিত হতে শুরু করে। 

জাতীয় জাদুঘর (National Museum) ট্যুরিস্ট গাইডলাইন-যেভাবে যাবেন, যা যা দেখবেন বিস্তারিত তথ্য!

এতোটুকু পর্যন্ত সময় ভালোই যাচ্ছিলো। তবে বিপত্তি বাধে ১৮৮৮ সালের ৭ এপ্রিলের দিকে। দূর্ভাগ্যবশত সেবার প্রবল ভূমিকম্পে পুরো আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয় এবং যথেষ্ট নাজুক অবস্থার সম্মুখীন হয় স্থাপনাটি। যার ফলে পুরো স্থাপনাটির পুনঃনির্মাণের প্রয়োজন পড়ে। সে-সময় পুরোনো স্থাপনাটিকে ঠিকঠাক করার পাশাপাশি বর্তমান উঁচু গম্বুজটিকেও সংযোজন করা হয়। 

এতে ব্যবহার করা হয় উন্নতমানের ইট। যা সাধারণত আনা হয়েছিলো রাণীগঞ্জ থেকে। পাশাপাশি প্রকৌশলী গোবিন্দ চন্দ্র রায় এর পরিচালনায় পরিচালিত হয় পুরো মেরামত কার্যক্রম। বলে রাখা ভালো ঢাকা শহরে আহসান মঞ্জিলের মতো এত জাঁকালো ভবন আর ছিল না বলে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা শীর্ষে উঠে আসে এই স্থাপনাটি। 

শুরুতেই প্রাসাদ এবং জমিদারির কাচারি হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্থাপনাটি। মূলত ১৯৯২ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে এখনো পর্যন্ত এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

আহসান মঞ্জিল নামক স্থাপনাটির জনপ্রিয়তা পেছনে বেশকিছু কারণ কাজ করেছে। তার মধ্যে একটি হলো স্থাপনাটির সৌন্দর্য। এছাড়াও প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা হওয়ায় ভবণটি যেনো সাধারণ জনগনের কাছে এক অপার বিস্ময়কর স্থাপনা হিসেবে ধরা দেয়। এছাড়াও সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো লর্ড কার্জন ঢাকায় এলে এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিতেন! এমনকি এখানেই থাকতেন। পাশাপাশি পশ্চিমাদের সব সময়ই আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এই স্থাপনাটির জুড়ি মেলা ভার। সুতরাং বুঝতেই পারছেন শুরুতেই আহসান মঞ্জিল এর ইতিহাসকে কেনো এতটা সমৃদ্ধ ইতিহাস বলেছি! 

আহসান মঞ্জিলের স্থাপনাশৈলী

ইতিহাস সম্পর্কে তো জানা গেলো! এবার চলুন স্থাপনাশৈলী বা ভবণটির ভেতরকার গল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি জানার চেষ্টা করি। 

সেই যুগে আহসান মঞ্জিল তৈরি হলেও এখনো এর স্থাপত্য সৌন্দর্য সাধারণ মানুষসহ প্রায় সকল পর্যায়ের পর্যটককে অবাক করে তুলে। ঢাকার প্রথম ইট-পাথরের তৈরি স্থাপত্য হিসেবে সৌন্দর্যের দিক দিয়ে যেনো একাই এশিয়া মাতাচ্ছে এই আহসান মঞ্জিল। সেই সময়ে স্থাপনাটির গম্বুজের চূড়াটি ছিলো ঢাকা শহরের সর্বোচ্চ স্থপনার প্রমাণ!

ভবণটির মূল ভবনের বাইরে শোভা পাচ্ছে ত্রি-তোরণবিশিষ্ট প্রবেশদ্বার। সেই সাথে উপরে ওঠার সিঁড়িগুলোকেও যথেষ্ট আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে। বৈঠকখানা ও পাঠাগার মিলে ভবণের একটি অংশ এবং অপর অংশটিও নিজ সৌন্দর্য গুণে নিজেকে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। অপর অংশটিতে মূলত নাচ-ঘর ও অন্যান্য আবাসিক কক্ষের দেখা মিলবে। নিচতলায় শোভা পাচ্ছে দরবারগৃহ ও ভোজন কক্ষ। 

আহসান মঞ্জিল মূলত দোতলা বিশিষ্ট একটি স্থাপনা। এর নিচ তলায় রয়েছে একটি বর্গাকার কক্ষ। যার চারকোণায় ইট দিয়ে ভরাট করে গোলাকার রূপ দেওয়ার ফলে বেশ আকর্ষণীয় লাগছে৷ ভেতরের যে দরবার হলটি রয়েছে তা মূলত সাদা, সবুজ ও হলুদ পাথরের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। 

একজন দর্শনার্থী জাদুঘর হিসেবে মূলত আহসান মঞ্জিলে যা যা দেখবেন তার মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হলো আহসান মঞ্জিলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আলোকচিত্র ও চিত্রকর্ম। এর পাশাপাশি রয়েছে কাটগ্লাস ও ঝাড়বাতির নমুনাসহ পুনঃনির্মাণের কারণে বিভিন্ন স্থাপনাটির বিবর্তনের বিভিন্ন চিত্র। যা পূর্বের আহসান মঞ্জিল কেমন ছিলো তা জানতে সাহায্য করবে। এছাড়াও অন্যান নিদর্শন তো থাকছেই। বলে রাখা ভালো প্রতিবন্ধীদের জন্য কিন্তু আহসান মঞ্জিলের টিকিট একেবারে ফ্রি। 

আহসান মঞ্জিলে যেভাবে যাবেন

যারা আহসান মঞ্জিলে যেতে চান তারা শুরুতেই সরাসরি পুরান ঢাকায় পৌঁছে যাবেন। এরপর পটুয়াখালীর রাস্তা ধরে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জিতে যেতে হবে। এবার বামে মোড় নিয়ে ওয়াইজঘাটের রাস্তা ধরে হাতের বামে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি পর্যন্ত চলে যাবেন। একাডেমির মুখোমুখি হলে খানিকটা রাস্তা পার করে সোজা তাকালেই চোখে পড়বে আহসান মঞ্জিলের পিংক কালারের দেওয়াল।

Ahsan Manzil Ticket কিনতে এখানে ক্লিক করুন

ইতি কথা

যারা মনে করেন ঢাকা শহরের মতো ব্যস্ত শহরে নিশ্বাস ফেলার মতো জায়গার বড্ড অভাব, তারা চাইলে এক্ষুনি ঘুরে আসতে আহসান মঞ্জিল খ্যাত এই অনন্য স্থাপনাটিতে। নির্দ্বিধায় বলতে পারি এর স্থাপনাশৈলীসহ পুরো পর্যটন স্থানটি আপনাকে একটি ফ্রেশ পরিবেশ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। মন ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারার সুযোগ করে দিবে। এছাড়াও যারা নবাবী আমলের ইতিহাস এতোদিন পড়ে এসেছেন, তারাও স্বচক্ষে এর স্থাপনাশৈলী উপভোগ করতে করতে হারিয়ে যেতে পারেন সেই পুরোনো যুগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *