জাদুঘরঢাকাঢাকা বিভাগদর্শনীয় স্থানবাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

লালবাগ কেল্লা কিভাবে যাবেন? কোথায় থাকবেন, ভ্রমণকালীন খাওয়া দাওয়া সহ বিস্তারিত ট্যুরিস্ট গাইড!

বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক বড় একটি অংশ জুড়ে অবস্থান করছে মোগল আমল। ফলে এই সময়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার ব্যাপারটি বেশ স্বাভাবিকই ধরা যায়। ঠিক তেমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয় লালবাগ কেল্লা!

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও নামকরা নিদর্শন সারাদেশে এক নামে পরিচিতি এই স্থাপনাটি। যার অবস্থান বাংলাদেশের বর্তমান রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে! চলুন তবে আজ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক এবং উপভোগ করা যাক লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ সম্পর্কিত একটি সঠিক গাইডলাইন! 

লালবাগ কেল্লা – Lalbagh Kella

লালবাগ কেল্লা পরিচিত 

তাহলে লালবাগ কেল্লা সম্পর্কিত ভ্রমণ গাইডলাইন শুরু করার আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক লালবাগ কেল্লার পরিচিতি সম্পর্কে। 

লালবাগ কেল্লা মূলত মোগল আমলে স্থাপিত প্রাচীন একটি দূর্গ। যা বর্তমানে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচিত হয়। 

চারশত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি উপভোগ করাকালীন সময়টাতে মনে হবে মোগল আমলের সেই পুরোনো মুহূর্তগুলি যেনো ফিরে এসেছে। চোখের সামনে ভাসছে সেই স্বর্নযুগ। 

বলে রাখা ভালো লালবাগ এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীর কূল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিলো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা লালবাগ কেল্লা। ঐতিহাসিক স্থাপনা হওয়ায় এই দর্শনীয় স্থানটি নিয়মিত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে থাকে। 

কষ্টি পাথর, মার্বেল পাথর এবং বাহারি রঙের টালির মিশ্রণে তৈরি হওয়া এই স্থাপনাটির কেবল ঐতিহাসিক দিকই নয়, বরং এর সৌন্দর্যের দিকটাও মুগ্ধ করে প্রতিটি দর্শনার্থীকে। এছাড়াও স্থাপনাটির সামনে থাকা সুন্দর ফুলের বাগানও প্রায় দেখার মতো। 

এই কেল্লাটির ভেতরে শত্রুদের প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মোগল আমলে একটি সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করা হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয় হলো বর্তমানে এই সুড়ঙ্গ পথ সরাসরি দেখার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

পরীবিবির সমাধি, হাম্মামখানা বা দরবার হল এবং তিন গম্বুজ মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিরও দেখা মিলবে এই লালবাগ কেল্লায়। মোটকথা শত্রু, সৈন্য, মগ এবং পর্তুগিজদের হাত থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে তৈরি করা এই লালবাগ কেল্লা সরাসরি উপভোগ না করলে এর আসল সৌন্দর্য কিংবা মর্ম বোঝা যাবে না। 

সুতরাং সরাসরি স্থাপনাটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আজই লালবাগ কেল্লার একটি ট্যুর প্ল্যান সেরে ফেলুন। তবে তার আগে চলুন স্থাপনাটি সম্পর্কে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নেওয়া যাক। 

লালবাগ কেল্লা কোথায় অবস্থিত – Lalbagh Kella Location

অবস্থানগত দিক দিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীর কূলে গড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। আরেকটু সহজভাবে বললে লালবাগ কেল্লার অবস্থান একবারে ঠিক রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে!

লালবাগ কেল্লা এর ইতিহাস – লালবাগ কেল্লা কে নির্মাণ করেন ?

যেহেতু Lalbagh Kella একটি ঐতিহাসিক স্থান সেহেতু একজন দর্শনার্থী হিসেবে এর ইতিহাস সম্পর্কেও জেনে রাখা উচিত। সে কথা মাথায় রেখে এই পর্যায়ে আমরা শেয়ার করবো লালবাগ কেল্লা এর ইতিহাস সম্পর্কে। 

প্রায় ৪০০ বছর আগে তৈরি করা হয় এই লালবাগ কেল্লা। এই কেল্লা আওরঙ্গবাদ বা লালবাগ কেল্লা সারাদেশে জনপ্রিয় এই স্থাপনা তৈরির সময়টাতে বাংলায় ছিলো মোগল আমলের চল! 

যারা লালবাগ কেল্লার বিভিন্ন ছবি সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়াগুলিতে দেখেছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনার দেখা লালবাগ কেল্লার ছবি মূলত পরীবিবির সমাধিস্থল। 

এই পরীবিবি ছিলেন আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র সম্রাট আজম শাহের স্ত্রী এবং এই পরীবিবি ছিলেন সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁ’র কন্যা। মূলত ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দেনমোহরে ১৬৬৮ সালের দিকে পরীবিবির সাথে আজম শাহের বিয়ে সম্পন্ন হয়। 

এখানে পরীবিবি সম্পর্কে একটা বিষয় একেবারে না বললেই নয়! পরীবিবি দেখতে পরীর মতোই সুন্দরী ছিলেন বলেই ঠিক এমন নামকরণ করা হয়। তবে অল্প বয়সে এই কন্যার মৃত্যুতে বৃদ্ধ পিতা শায়েস্তা খাঁ খুবই ভেঙে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষোভে-দুঃখে তিনি ‘অপয়া’ ভাবা শুরু করলেন এই লালবাগ কেল্লাকে! মৃত্যুর কিছুদিন পর Lalbagh Kella তৈরির কাজ শেষ হলে পরীবিবিকে দাফন করা হয় এই লালবাগ কেল্লার ভেতরকার অংশে। 

লালবাগ কেল্লা এর স্থাপনাশৈলী 

মূলত Lalbagh Kella মূলত একটি পুরোনো এবং মোগল আমলে তৈরি করা দূর্গ। স্থাপনাটির একটি অংশে যে দিওয়ানি আম নামের দরবার হল বা হাম্মামখানাটি রয়েছে সেটিকে মূলত লালবাগ কেল্লার প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। বলে রাখা ভালো লালবাগ কেল্লার এই প্রাণকেন্দ্র বর্তমানে একটি সম্পূর্ণ জাদুঘরের প্রত্নসম্ভার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও এই ভবনের প্রবেশ করার মুহুর্তে চোখে পড়বে মুঘল আমলের কামান! 

লালবাগ কেল্লা মূলত কয়েকটি স্থাপনার সমষ্টি। এদিক দিয়ে এই মূল স্থাপনটির অন্যতম একটি অংশবিশেষ হলো তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। যা তৈরি করেছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র সম্রাট আজম শাহ! তখনকার সময়ে তিনি বাংলার সুবেদার ছিলেন বলেই মসজিদটি তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন! 

তবে লালবাগ কেল্লার মূল আকর্ষণ হলো পরীবিবির মাজার। যা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সুদূর রাজমহল থেকে আনা কালো ব্যাসল্ট পাথর। স্থাপনাটির দরজা ও খিলান তৈরি করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে শ্বেত চন্দন কাঠ! সবশেষে মূল সমাধি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সাদা মার্বেল পাথরের বড় বড় ফলক। 

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো নির্মাণের প্রায় ৩০০ বছর পর লালবাগ দুর্গের সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে একটা সময়ে এসে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এই লালবাগ কেল্লা। 

লালবাগ কেল্লায় যেভাবে যাবেন

রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত এই লালবাগ কেল্লায় যেতে হলে প্রথমত আপনাকে ঢাকায় পৌঁছে যেতে হবে। এরপর ঢাকার গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারে এসে লেগুনা বা টেম্পু অথবা রিকশা- যেকোনো একটাতে চড়ে সোজা চলে যাওয়া যাবে লালবাগ কেল্লায়। 

Lalbagh Kella ভ্রমণে যেখানে খাওয়া-দাওয়া করবেন

মূলত Lalbagh Kella ভ্রমণ করতে গিয়ে খাবারের দরকার পড়লে সেখানকার যেকোনো খাবার হোটেলের সাহায্য নেওয়া যেতে পারেন। ঢাকা-শহরের খাবারের দোকান কিংবা হোটেলের কোনো অভাব নেই। 

লালবাগ কেল্লা ভ্রমণে যেখানে রাত্রিযাপন করবেন

এক্ষেত্রে লালবাগ কেল্লার আশেপাশে কিংবা ঢাকার কেন্দ্রস্থলে থাকা যেকোনো থাকবার মতো হোটেলে উঠে পড়তে পারেন। আশা করি এখানে বাজেট অনুযায়ী নিজের ইচ্ছেমতো হোটেল বাছাই করে নিতে কোনো সমস্যা হবে না। 

লালবাগ কেল্লা ভ্রমণের বাড়তি টিপস

আপনার পরবর্তী Lalbagh Kella ভ্রমণকে আরো বেশি অর্থবহ করে তুলতে আমাদের এবারের বাড়তি টিপস সম্পর্কিত অংশটি হয়তো কিছুটা হলেও কাজে লাগবে। চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক লালবাগ কেল্লা ভ্রমণের কিছু বাড়তি টিপস সম্পর্কে। 

  • মনে রাখবেন লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের সময়সূচি বিভিন্ন সময়ভেদে পরিবর্তিত হয়
  • সাধারণত এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মাসে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের সুযোগ থাকে 
  • আবার অক্টোবর-মার্চের দিকে স্থাপনাটিতে ভ্রমণ করতে চাইলে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই ব্যবস্থা করে নিতে হবে
  • কেবলমাত্র সপ্তাহের একটি দিনে অর্থ্যাৎ সোমবার দুপুর ২টা থেকে কেল্লার ফটক খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে
  • লালবাগ কেল্লা এর ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে সপ্তাহের ১টি দিন অর্থ্যাৎ রবিবারকে নির্ধারিত করা হয়েছে
  • বলে রাখা ভালো স্থাপনাটিকে প্রতি শুক্রবার সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়
  • পাশাপাশি সরকারি যেকোনো বিশেষ দিবসে লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের কোনো সুযোগ নেই
  • লালবাগ কেল্লা স্থাপনার জনপ্রতি টিকিট মূল্য ২০ টাকা
  • বিদেশীদের ক্ষেত্রে প্রতি টিকেটের মূল্য হিসেবে ২০০ টাকা পে করতে হবে
  • যারা বয়সে পাঁচ বছরের ছোট তাদের ক্ষেত্রে কোনোধরণের টিকিট-মূল্য গ্রহণ করা হবে না

ইতি কথা 

দেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে নিজের সাথে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাথে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করলে চলবে না। সুতরাং দেশের বাইরে লাক্সারিয়াস ট্যুর দেওয়ার পাশাপাশি লালবাগ কেল্লার মতো আমাদের দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আশা করি আমরা আমাদের এই ঐতিহ্যকে কখনোই হারিয়ে যেতে দেবো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *