জনপ্রিয়জাদুঘরঢাকাঢাকা বিভাগবাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

জাতীয় জাদুঘর (National Museum) ট্যুরিস্ট গাইডলাইন-যেভাবে যাবেন, যা যা দেখবেন বিস্তারিত তথ্য!

আপনার কি ঐতিহাসিক বিষয়াদির উপর বাড়তি ঝোঁক কাজ করে? যদি করে থাকে তবে আমাদের আজকের এই আয়োজনের সাথে থাকার অনুরোধ রইলো। কারণ আজ আমরা আলোচনা করবো ইতিহাস-প্রেমীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান জাদুঘর নিয়ে। আজ থাকছে জাতীয় জাদুঘরের যত গল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি। আশা করি শুধুমাত্র এই একটি গাইডলাইন আপনার এই জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণকে করে তুলবে আরো অর্থবহ এবং সুশৃঙ্খল! 

জাতীয় জাদুঘর – National Museum Dhaka

জাতীয় জাদুঘর পরিচিতি

প্রতিটি দেশেরই একটি করে প্রধান জাদুঘর থাকে। ঠিক তেমনই আমাদের বাংলাদেশে সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাথে তরুণ প্রজন্মকে পরিচিত করিয়ে দিতে কাজ করছে বাংলাদেশের এই জাতীয় জাদুঘর৷ বাংলাদেশ নৃতত্ব, চারুকলা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং আধুনিক ও বিশ্ব-সভ্যতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কি নেই এই জাদুঘরে! 

এই জাদুঘরের ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৪ টির মতো প্রদর্শনীকক্ষ বা গ্যালারি পর্যটককে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পুরোনো ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সাহায্য করছে। এ-যেনো সমগ্র বাংলাদেশের এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। যার সাহায্যে পুরো বাংলাদেশকে বারবার পড়ে নেওয়া যায়। মূলত ইতিহাস-প্রেমী কিংবা শিশুদের কাছে এই পর্যটন স্থানটি বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচিত হয়। 

জাতীয় জাদুঘর কোথায় অবস্থিত – National Museum Location

আমাদের আজকের আলোচিত এই পর্যটন স্থান অর্থ্যাৎ জাতীয় জাদুঘরের অবস্থান মূলত রাজধানী ঢাকায়। পুরো ঠিকানা হলো শাহবাগ, ঢাকা, বাংলাদেশ! যারা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক ও চারুকলা ইন্সটিটিউটের চেনের তাদের জন্যে তো প্লাস পয়েন্ট। মূলত ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক ও চারুকলা ইন্সটিটিউটের পাশেই অবস্থিত আমাদের আজকের এই আলোচিত স্থাপনা “জাতীয় জাদুঘর”!

সুতরাং যারা ঢাকায় অবস্থান করছেন তাদের ক্ষেত্রে এই জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণে বাড়তি সুবিধা যোগ হবে। তবে যারা সত্যিকারের ইতিহাস-প্রেমী তারা অবশ্যই শত ব্যস্ততাকে গুটিয়ে বহুদূর থেকে জার্নি করে এই জাদুঘর ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। 

জাতীয় জাদুঘর এর ইতিহাস 

আপনি কি আমাদের বর্তমান এই জাতীয় জাদুঘরের পেছনের গল্প কিংবা ইতিহাস সম্পর্কে জানেন? না জানলে এক্ষুণি জেনে নিন এই জাদুঘরের শুরুর দিককার গল্প। 

সে-সময় পূর্ব বাংলায় কোনো জাদুঘর সম্পর্কিত স্থাপনা ছিলো না। যার কারণে পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে জানানোর ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফলে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর তারিখের দিকে প্রথম জাদুঘরের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। ১ নভেম্বর  “দ্য ঢাকা নিউজ”  পত্রিকায় জাদুঘরের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে একটি আলোচনা প্রকাশ করা হয়। 

পরবর্তীতে অবশেষে ১৯১৩ সালে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আগমন ঘটে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই বাংলায় তৈরি করা হবে একটি জাদুঘর। যেখানে সমগ্র বাংলার ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা হবে। সে বছরে তৎকালীন সচিবালয়ে জাদুঘর তৈরির উদ্দেশ্যে আলাদা একটি তহবিল গঠন করা হয়। মূলত বর্তমান ঢাকা মেডিকেলের স্থানটিকে সে-সময় পূর্ব বাংলার সচিবালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানেই জাদুঘর তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯১৩ সালে দুই হাজার রুপিসহ একটি তহবিল গঠন করা হয়। 

সময়টা ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট! সে-সময় ‘ঢাকা জাদুঘর’ নামে যাত্রা শুরু করে একটি জাদুঘর। পরবর্তীতে এই ঢাকা জাদুঘরই হয়ে উঠে জাতীয় জাদুঘর। সুতরাং এই জাতীয় জাদুঘরকে বাংলাদেশের ঢাকা জাদুঘরের উত্তরসূরীও বলা যায়। 

সোনারগাঁও জাদুঘর কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন এবং ভ্রমণের সময় সূচি সহ বিস্তারিত তথ্য!

১৯১৩ সালে যখন পূর্ব বাংলায় ঢাকা জাদুঘর তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়, তখন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি কক্ষে এই স্থাপনাটির উদ্ভোদন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে ঠিক তার কয়েক বছর পরেই অর্থ্যাৎ ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর তারিখের দিকে সেই ঢাকা জাদুঘরকে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি প্রধান করা হয়। 

আপনি কি জানেন বর্তমান জাতীয় জাদুঘরের প্রথম কিউরেটর কে ছিলেন? জাতীয় জাদুঘরের প্রথম এবং সূচনাকালীন কিউরেটর বা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন এন গুপ্ত। যদিও এই সিদ্ধান্ত কেবল অস্থায়ীভাবেই গ্রহণ করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী নামের এক ভদ্রলোক। 

বলে রাখা ভালো আমাদের আজকের এই National Museum কিন্তু ব্রিটিশদের তৈরি করে দেওয়া একটি স্থাপনা! অবাক লাগছে? অবাক লাগবারই কথা! কেননা ব্রিটিশরা কখনোই বাংলার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখবার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে হুট করে এই স্থাপনা তৈরি করে দেওয়ার পেছনে কারণ ছিলো বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। 

জাতীয় জাদুঘরের স্থাপনাশৈলী

এবার আসি জাতীয় জাদুঘরের স্থাপনাশৈলী সম্পর্কে। জাতীয় জাদুঘর মূলত ৪ তলাবিশিষ্ট একটি বিশাল ভবন৷ যা তৈরি করা হয়েছিলো প্রায় ৮ একর জমির উপর। পুরো জাদুঘর জুড়ে রয়েছে সর্বমোট ৪৪ টি গ্যালারি। বলে রাখা ভালো পুরো জাদুঘরটি বাংলার প্রখ্যাত স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন এর নকশায় তৈরি করা হয়েছে। 

জাতীয় জাদুঘরে যা যা দেখবেন

যারা জাতীয় জাদুঘরে ইতিমধ্যেই ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তারা নিশ্চয় জানতে চান জাতীয় জাদুঘরে কি কি দেখার সুযোগ রয়েছে! আপনাদের এই আগ্রহের ব্যাপারটিকে মাথায় রেখে আর্টিকেলের এই অংশে আমরা আলোচনা করবো জাতীয় জাদুঘরে কি কি দেখবেন সে-সম্পর্কে! চলুন তবে শুরু করা যাক।

শুরুতেই বলে রাখি জাতীয় জাদুঘরে প্রায় ৬ টির মতো বিভাগ রয়েছে। এগুলি হলো: 

  • প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ
  • ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা
  • জাতিতত্ত্ব ও অলঙ্করণ শিল্পকলা
  • সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা
  • জনশিক্ষা বিভাগ
  • সংরক্ষণ গবেষণাগার

এছাড়াও প্রায় ৯৪ হাজারেরও বেশি নিদর্শন নিয়ে কাজ করছে এই National Museum। নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও ফটোর সাথে প্রতিটি নিদর্শনকে খুব কাছ থেকে দেখার মারাত্মক সুযোগ করে দিয়েছে এই জাদুঘর। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ইতিহাস সম্পর্কে জানতে এই জাদুঘর কতটা কার্যকর ভুমিকা পালনে সক্ষম হচ্ছে।  

প্রতিটি নিদর্শনকে সাজানোর ব্যাপারে যদি বলি, তাহলে বলতে হয় ৪ হাজার নিদর্শন ৪৫ টি প্রদর্শন কক্ষে খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে৷ 

যারা National Museum সচক্ষে উপভোগ করতে চান তারা টিকিট কেটে তবেই প্রবেশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০ টাকা মূল্য পরিশোধ করে টিকিট নিতে হবে। তবে বিদেশীদের ক্ষেত্রে এর মূল্য ৫০০ টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের ৩০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হবে। 

জাতীয় জাদুঘরে যেভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো জেলা থেকে সরাসরি ঢাকা জেলায় চলে যেতে হবে। সেখান থেকে শাহবাগ রুটে গেলেই যেকোনো যান করে ঢাকা মেডিকেলের পাশে চলে যেতে হবে। সেখানেই চোখে পড়বে জাতীয় জাদুঘর! 

জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণে যেখানে খাওয়া-দাওয়া করবেন

National Museum ভ্রমণে খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা পড়লে শাহবাগের যেকোনো খাবার হোটেলে ঢুকে পড়তে পারেন। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো হয় স্ট্রিট ফুড টেস্ট করতে পারলে! কারণ ঢাকার স্ট্রিট ফুডের জনপ্রিয়তা রয়েছে সারা বাংলায়। স্বাদের দিক দিয়ে অনন্য এই খাবার মিস করাটা ঠিক হবে না কিন্তু! 

জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণে যেখানে রাত্রিযাপন করবেন

যাদের জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণে গিয়ে কোনো কারণে ঢাকায় থাকার প্রয়োজন রয়েছে তারা শাহবাগের যেকোনো হোটেলে উঠে পড়তে পারেন। হোটেল রহমানিয়া, হোটেল সেভেন স্টার, হোটেল গ্রিন টাওয়ারের মতো অসংখ্য হোটেল রয়েছে শাহবাগে! 

ইতি কথা

জাতীয় জাদুঘর এর গল্প সম্পর্কে তো জানা গেলো! এবার সরজমিনে তা উপভোগের পালা। যারা এখনো জাতীয় জাদুঘর ঘুরে আসেননি তাদের অনুরোধ করবো দ্রুত একটি ট্যুর প্ল্যান করে ফেলার। জ্ঞান আমাদের প্রত্যেকের কাছে মহামূল্যবান সম্পদ। এই সম্পদ বাড়াতে এবং নিজের শেকড়ের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে জাতীয় জাদুঘর ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *