চট্টগ্রামচট্টগ্রাম বিভাগদর্শনীয় স্থানপাহাড়বাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

চন্দ্রনাথ পাহাড় (Chandranath Hill) যেভাবে যাবেন, যেখানে থাকবেন বিস্তারিত তথ্য জানুন!

আপনি কি একজন পাহাড়প্রেমী? পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে কি আপনার আলাদা তৃপ্তি কাজ করে? উত্তর যদি “হ্যাঁ” হয়, তবে আজকের এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই! আজ আমরা শেয়ার করবো চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ গাইডলাইন। যেখানে থাকবে চন্দ্রনাথ পাহাড় পরিচিতি, চন্দ্রনাথ পাহাড় এর অবস্থান এবং চন্দ্রনাথ পাহাড় এর ইতিহাসসহ অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য। চলুন তবে দেরি না করে শুরু করা যাক। 

চন্দ্রনাথ পাহাড় – Chandranath Hill

চন্দ্রনাথ পাহাড় পরিচিতি

মূলত চন্দ্রনাথ পাহাড় বিশাল একটি পাহাড়। যা সাধারণত ধর্মীয় দিক দিয়ে খুব বেশি গুরুত্বের সাথেই সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে আছে। বিশেষ করে সাধু-সন্নাসীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্ত অনুরাগীদের কাছে এই পাহাড় তীর্থ স্থান হিসেবেই অধিক পরিচিত। বলে রাখা ভালো এই চন্দ্রনাথ পাহাড় এর উপরেই আছে এক জাগ্রত শিবমন্দির। যার ফলে হিন্দু ধর্মের পর্যটকদের আনাগোনাই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়!

হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই পাহাড়ের রাজ্য ফেনী নদী পার হয়ে সরাসরি চট্টগ্রামের সাথে মিশেছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই পাহাড় আয়তনের দিক দিয়ে ঠিক কতটা বিস্তৃত! মূলত এই পাহাড়টিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হতে হয়েছে। কেবল এই ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রামে থাকা চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটারের মতো! 

যারা ভ্রমণপিয়াসী তারা হয়তো ইতিমধ্যেই সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের নাম শুনেছেন! কিংবা অনেকেই হয়তো এই পর্যটন স্থানটিতে ঘুরেও এসেছেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক কিন্তু চন্দ্রনাথ পাহাড়েরই একটি অংশ। যা পর্যটন পার্ক হিসেবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত হয়েছিলো। 

যেকোনো দর্শনার্থীদের কাছে রোমাঞ্চকর এক স্থান হিসেবে এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। মূলত এই রোমাঞ্চকর পরিবেশের জন্যই পর্যটকেরা বেশ আগ্রহ করে স্থানটিতে বেরিয়ে আসেন। এছাড়াও যারা বিভিন্ন উঁচু পাহাড়ে উঠতে ভালোবাসেন তারাও এই পাহাড়টির উপরে উঠার সাহস করে বসেন! কেউ কেউ সফল হোন! কেউ বা আবার ক্লান্ত হয়ে নিচে নেমে আসেন৷ 

সবচেয়ে বড় কথা হলো চট্টগ্রামের এই জনপ্রিয় চন্দ্রনাথ পাহাড়টি এক বা একাধিকবার ঘুরে আসবার মতো একটি স্থান। সবুজের সমারোহ, উঁচু পাহাড়, এডভেঞ্চার টাইপের ফিলিংস… সবমিলিয়ে জীবনের অবসাদ দূর করতে কিংবা জীবনে নতুন করে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে একটিবারের জন্যে হলেও এই পাহাড়ে ঘুরে আসা উচিত। 

চন্দ্রনাথ পাহাড় এর অবস্থান – Chandranath Hill Location

মূলত চন্দ্রনাথ পাহাড় চট্টগ্রাম জেলার এক অনন্য পর্যটন স্থান। বলে রাখা ভালো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার পূর্বে গেলেই দেখা মিলবে এই বড়সড় এবং রোমাঞ্চকর পাহাড়টির। ১১৫২ ফুট বা ৩৬৫ মিটার উচ্চতার এই পাহাড় মূলত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কাছেই অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যক্ষেত্র!

চন্দ্রনাথ পাহাড় এর ইতিহাস

চন্দ্রনাথ পাহাড় নিয়ে বেশ রহস্যে ঘেরা এবং রোমাঞ্চকর গল্প রয়েছে। এসব গল্পকে আপনি চাইলে ইতিহাস হিসেবেও ধরে নিতে পারেন৷ 

শুরুতেই বলে রাখি এই পাহাড়টিতে পৌরাণিক স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য মঠ-মন্দির থাকায় পুরোনো দিনের রহস্যময় ঘটনার সন্ধান পাওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। 

পৃথিবীতে মূলত এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায় আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে। এই সময়টাকে মূলত সাধারণত রাজমালা অনুসারে ধরে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো গৌরের বিখ্যাত আদিসুরের বংশধর রাজা বিশ্বম্ভর সেসময় সমুদ্রপথে চন্দ্রনাথে পৌঁছার চেষ্টা করেন। সেই সময়টাতে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উঁচুতে ছিলো চন্দ্রনাথ মন্দির। সেই মন্দিরে ছিলো একটি শিব মূর্তি! ত্রিপুরার শাসক ধন মানিক্য এই মূর্তি রাজ্যে সরিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা করলেও একটা সময় তিনি এই হীন কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দেন।

এছাড়াও এই চন্দ্রনাথ পাহাড় সম্পর্কে বেশকিছু ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা রটনা প্রচলিত ছিলো। আপনি কি জানেন সীতাকুণ্ডে ঠিক কোন সময় জনবসতি গড়ে উঠে? সীতাকুণ্ডে মূলত প্রাচীন নব্যপ্রস্তর যুগের পর থেকে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করে৷ এদিকে  ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীর দিকে আজকের এই সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অধীনে থাকায় সীতাকুণ্ডসহ চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দখলদারিত্ব চলে যায় আরাকানদের হাতে। ১২৮ বছরের বেশি সময় ধরে এই দখলদারিত্ব চলতে থাকে। পরবর্তীতে সেনাপতি বুজরুগ উন্মে খানের হাতে আরাকানদের পরাজয় ঘটে এবং তারা চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ডসহ চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দখলদারিত্ব হারাতে বাধ্য হয়। মূলত সেনাপতি বুজরুগ উন্মে খান ছিলেন একজন দক্ষ মুঘল সেনাপতি। 

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় যে মন্দিরটি রয়েছে সেই মন্দিরটিতে একটা সময় মহামুনি ভার্গব বসবাস করতেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় একটা সময় অযোদ্ধার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্রও নাকি এই পাহাড়ে বনবাসের উদ্দেশ্যে বসবাস শুরু করেন। এদিকে সে উদ্দেশ্য মহামুনি ভার্গব এখানে স্নানের জন্য তিনটি কুণ্ড সৃষ্টি করার প্রয়োজনবোধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তা সম্পন্নও করেন। 

এমনসব ঐতিহাসিক ঘটনাটির সাক্ষী এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে বর্তমানে দেয়াল দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। যাতে করে দর্শনার্থীরা সহজে এসব স্থান এবং এসব স্থানের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নিতে পারে। 

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সৌন্দর্য 

২২০০ এরও বেশি সিঁড়ির সাহায্যে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মাথায় উঠবার মতো এক্সপেরিমেন্ট প্রত্যেকটি ব্যাক্তিরই একটিবারের জন্যে হলেও উপভোগ করা উচিত। তবে এসব সিঁড়ির কোনো কোনো অংশ অতিরিক্ত পিচ্ছিল ও সংকীর্ণ হওয়ায় অনুরোধ করবো সতর্কতার সাথে চলাচল করার! এছাড়াও এই পাহাড়ের উঁচুতে দেখা মিলবে শিব মন্দির! 

পাহাড় উপভোগ করতে যাবেন অথচ ঝর্ণার দেখার সুযোগ পাবেন না তা কি হয়? চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণে গেলে ঠিক ১৫ মিনিট ওঠার পর একটি ছোট ঝর্ণা চোখে পড়বে। ঝর্ণার পাশাপাশি আশেপাশের সবুজে ঘেরা অকৃত্রিম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ তো থাকছেই! এছাড়াও নিরিবিলি পরিবেশে থেকে সেখানকার পাহাড়ের কোলে বসে থাকা পাখির ডাক, বাতাসে গাছের পাতার শব্দ উপভোগ করবার মতো প্রশান্তি হয়তো অন্য কোথাও পাবেন না। 

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যেভাবে যাবেন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অবস্থান। সুতরাং লজিক অনুযায়ী শুরুতে আপনাকে পৌঁছাতে হবে চট্টগ্রামে। চাইলে ঢাকা টু সীতাকুণ্ডে সরাসরি চলে আসা যায়। তবে তা সম্ভব না হলে চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে বাসে করে চলে যাওয়া যাবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে! আর যারা ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো জেলা থেকে আসতে চাইছেন তাদের ক্ষেত্রে সরাসরি চট্টগ্রামে এসে, সেখান থেকে অলংকার মোড় এবং সবশেষে সরাসরি চন্দ্রনাথ পাহাড়ে পৌঁছে যেতে হবে। 

চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণে যেখানে খাওয়া-দাওয়া করবেন

যেহেতু চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কোনোধরণের খাবার হোটেলের ব্যবস্থা নেই সেহেতু আপনাকে অবশ্যই সাথে করে খাবার নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে সীতাকুণ্ড শহর কিংবা চট্টগ্রাম শহর থেকে খাবার কিনে নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়াও চাইলে বাসায় তৈরি খাবারও সাথে করে নিয়ে যেতে পারেন। 

চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণে যেখানে রাত্রিযাপন করবেন

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আশপাশে এলাকায় থাকার মতো কোনো হোটেলের ব্যবস্থা করা হয়নি। যেহেতু পাহাড়ের উঁচুতে উঠবেন এবং লম্বা জার্নিও করবেন সেহেতু রাতটা কোথাও কাটানোর প্রয়োজন পড়তে পারে। এক্ষেত্রে সরাসরি চট্টগ্রাম শহরে চলে যেতে হবে এবং সেখানকার কোনো ভালো হোটেলে উঠে পড়তে হবে। সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো সীতাকুণ্ডেও আদৌ কোনো ভালোভাবে থাকবার মতো হোটেল নেই। যার কারণে অগত্যা আপনাকে যেতে হবে চট্টগ্রামের মেইন শহরে! 

ইতি কথা

আমাদের আজকের এই চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ সম্পর্কিত গাইডলাইনটি কেমন লেগেছে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! আর হ্যাঁ! যারা এখনো এই অসম্ভব সুন্দর পাহাড়টি ঘুরে আসেননি তাদের অনুরোধ করবো একটিবারের জন্য হলেও যেনো এই পাহাড়টি সরাসরি উপভোগ করে আসতে! কেননা প্রকৃতি নিজ হাতে আমাদের কত সৌন্দর্য যে ঢেলে দিয়েছে তার এক উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই চন্দ্রনাথ পাহাড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *